ডিভোর্সের পর যৌতুক বা যৌতুক সংক্রান্ত অপরাধের মামলার আইনগত ভিত্তি কী??

Spread the love

ডিভোর্সের পর যৌতুক বা যৌতুক সংক্রান্ত অপরাধের মামলার আইনগত ভিত্তি কী??
(এডভোকেট মোঃকাওসার হোসাইন)

যৌতুক নিশ্চয়ই একটি ঘৃনিত সামাজিক অপরাধ।আমাদের সমাজের যৌতুক দাবি করা,গ্রহন করা বা যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনা যেমন ঘটে তেমনি যৌতুকের মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানী করার ঘটনাও ঘটে অথচ আইনের অন্যতম লক্ষ্য হলো অপরাধীর শাস্তি হোক কিন্তু কোন নিরীহ বা নির্দোষ লোক যেন হয়রানীর শিকার না হয়।একসময় বাংলাদেশে বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা কম থাকলেও বর্তমানে নানাবিধ কারনে বিবাহ বিচ্ছেদের হার আগের তূলনায় অনেক বেশী।বিবাহ বিচ্ছেদের পর বা বিবাহ বিচ্ছেদের নোটিশ প্রেরনের পরেও যৌতুক দাবির অভিযোগে বা যৌতুক গ্রহনের অভিযোগে বা যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী নির্যাতনের অভিযোগে আমাদের দেশে অনেক মামলা দায়ের হয়।এজাতীয় মামলার পক্ষে বিপক্ষে নানাধরনের মতামতও পাওয়া যায়,অনেকেরই প্রশ্ন থাকে এজাতীয় মামলার আইনগত ভিত্তি কী?এজাতীয় মামলার আইনগত ভিত্তি নিয়ে যৌক্তিক ব্যাখা উপস্থাপনের জন্য আমাদের জানা দরকার আইনানুযায়ী যৌতুকের সংজ্ঞা কী এবং প্রচলিত আইনে যৌতুক সংক্রান্ত অপরাধগুলো কী কী?বাংলাদেশে বিদ্যমান যৌতুক নিরোধ আইন-২০১৮ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০(সংশোধনী-২০০৩) এ সম্পর্কে সুসষ্পষ্ট ধারনা দেয়া আছে। ১ অক্টোবর ২০১৮ তারিখ মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক বর্তমানে কার্যকর যৌতুক নিরোধ আইন অনুমোদনের পূর্বে এদেশে যৌতুক নিরোধ আইন-১৯৮০ কার্যকর ছিল।বর্তমানে কার্যকর যৌতুক নিরোধ আইন-২০১৮ এর ধারা-২(খ) এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন-২০০০(সংশোধনী-২০০৩)এর ২(ঞ) এর (অ) এবং (আ) ধারায় যৌতুকের সংজ্ঞা দেয়া আছে।উল্লেখিত দুটো আইনেই যৌতুকের সংজ্ঞা অনেকটা একই যার বিষয়বস্তু হলো বিবাহ স্থাপনের শর্ত হিসেবে বা বৈবাহিক সম্পর্ক বলবৎ রাখার শর্ত হিসেবে বিবাহের পূর্বে বা বিবাহের সময় বা বিবাহের পরে বিবাহের কোন পক্ষ বা তার প্রতিনিধি কর্তৃক অন্যপক্ষের নিকট প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দাবিকৃত বা প্রদত্ত বা প্রদানে সম্মত কোন অর্থ সামগ্রী বা অন্য কোন সম্পদই হলো যৌতুক।যৌতুক নিরোধ আইন-২০১৮ এর ৩ ধারায় যৌতুক দাবি করার শাস্তি ও অপরাধ, ৪ ধারায় যৌতুক প্রদান বা গ্রহন বা এ বিষয়ে সহায়তা বা এ সংক্রান্ত চুক্তি করার অপরাধ ও শাস্তি বর্ননা করা আছে।পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১(ক) ধারায় যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীর মৃত্যু ঘটানো বা ঘটানোর চেষ্টার অপরাধ ও শাস্তি,১১(খ) ধারায় যৌতুকের দাবিতে মারাত্নক জখম ঘটানোর অপরাধ ও শাস্তি এবং ১১(গ)ধারায় যৌতুকের দাবিতে সাধারন জখম ঘটানোর অপরাধ ও শাস্তি বর্ননা করা আছে।এখন মূল আলোচ্য বিষয়ে যওয়া যাক যে ডিভোর্সের পরে উপরোক্ত বিধান অনুযায়ী কারো বিরুদ্ধে যৌতুক আইনে বা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের হলে তার আইনগত পরিনতি কী?এই সকল মামলার আইনগত বিশ্লেষন দুইভাগে ভাগ করা যায়-(১)যদি বর্নিত মামলার ঘটনার তারিখ ডিভোর্স হবার পূর্বে হয় তাহলে মামলাটি চলতে আইনগত কোন বাধা নেই,সেক্ষেত্রে স্বাক্ষ্য প্রমানে অপরাধী নির্দোষ হলে তা প্রমান করে খালাস পেতে পারে এবং দোষী হলে শাস্তি পেতে পারে। Salam Mollick Vs State 48 DLR 329 মামলার রায় থেকে যৌতুক মামলার পরিধি বিশ্লেষন করলে উপরোক্ত বিষয় সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যায়।(২)যদি মামলার ঘটনার তারিখ ডিভোর্স হবার পরে দেখানো হয় তাহলে আইনত মামলাটি চলতে পারে না।কারন আইনে যৌতুকের যে সংজ্ঞা দেয়া আছে তাতে যৌতুকের দাবি বিবাহের পূর্বে বা বিবাহের সময় বা বিবাহ বলবৎ থাকাকালীন সময়ে বিবাহ স্থাপন বা বলবৎ রাখার শর্ত হিসেবে দাবি করতে হবে কিন্তু ডিভোর্স হবার পরে স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক বিদ্যমান থাকেনা বা বৈধ কোন সম্পর্ক থাকে না তাই যৌতুক সংশ্লিষ্ট অপরাধ করার উপাদান থাকেনা।তাই স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ডিভোর্স হবার পরে যদি ডিভোর্স সংঘটিত হবার পূর্বে সত্যিকারের যৌতুক চাওয়ার কোন ঘটনা না থাকে তাহলে কাউকে হয়রানী করা বা ঘায়েল করার উদ্দেশ্যে যৌতুক সংক্রান্ত অপরাধের মিথ্যা মামলা করা ঠিক না কারন যৌতুক নিরোধ আইনের-৬ ধারায় এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের-১৭ ধারায় মিথ্যা মামলা দায়েরের শাস্তির সুনিদির্ষ্ট বিধান দেয়া আছে।একজন নাগরিক হিসেবে যেকোন আইনগত প্রতিকার গ্রহন করতে যাওয়ার পূর্বে আমাদের উচিত উক্ত বিষয় ও আইন সম্পর্কে সঠিক ও পরিপূর্ন ধারনা গ্রহন করা তাতে হয়রানী,ভোগান্তি বা ক্ষতিগ্রস্থ হবার সূযোগ কম থাকে।

Leave a Comment