ঝালকাঠিতে লবণ শিল্পের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখছে ১১টি মিল

Spread the love

মোঃমনির হোসেন ঝালকাঠী ঃনদী পথের উন্নত যোগাযোগের কারণে ঝালকাঠি শহরে গড়ে উঠেছে ব্যবসা বাণিজ্যের কেন্দ্র। বঙ্গোপসাগরের অপরিশোধিত লবণ এ জেলায় এসে পরিশোধিত হয়। ফলশ্রুতিতে ঝালকাঠিতে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি লবণ শোধনাগার। ঐতিহ্যবাহী বলতে হয় ঝালকাঠির লবণ পরিশোধন কারখানাগুলোকে। পাকিস্তান আমলে এখানে কারখানাগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়। ঝালকাঠিতে ব্যবসার প্রাচুর্য লক্ষ্য করেই প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭টি লবণ শোধনাগার। কিন্তু সময়ের করাল গ্রাসে এখন মাত্র ১১টি শোধনাগার চালু আছে, বাকিগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। এ ১১টি মিলই টিকিয়ে রাখছে ঝালকাঠি লবণ শিল্পের ঐতিহ্য। খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, আবু ছালেক শরীফের পরিচালনায় মমতাজ বেগম নামের লাইসেন্সে শরীফ সল্ট, লায়লা সিদ্দিকির মালিকানায় নিউ ঝালকাঠি সল্ট, ইকবাল হোসেন’র পরিচালনায় আজাদ সল্ট, হুমায়ুন কবীর খান গং এর পরিচালনায় লাকি সল্ট, ওয়ালিউর রহমান হিরু’র পরিচালনায় জয়নাল আবেদীনের লাইসেন্সে কোয়ালিটি সল্ট, এমএ কুদ্দসের পরিচালনায় দি ঝালকাঠি সল্ট, বাপ্পী’র পরিচালনায় ক্রিসেন্ট সল্ট, হুমায়ুন কবীরের পরিচালনায় ধানসিড়ি সল্ট, বরকত সল্ট’র মালিক আবুল কালাম মারা যাওয়ায় তার উত্তরাধিকাররা এখন মিল পরিচালনা করছেন, তাজ সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজের কার্যক্রমও চলমান আছে। বন্ধ হয়ে গেছে মিতালী, নূর, কুমিল্লা, মদিনা, মিনি ও সুরভী সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ। উল্লেখিত লবণ ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানাগেছে, ব্রিটিশ আমল থেকে ঝালকাঠিতে ছিলো লবণের মোকাম। ঝালকাঠি থেকে বৃহত্তর ফরিদপুর, খুলনা, বরগুনা, পাথরঘাটা, ভোলা, যশোর. সাতক্ষিরা, কুষ্টিয়া, নওপাড়া, আশুগঞ্জ ও নারায়নগঞ্জে লবণ সরবরাহ হতো। এ কারণে পাকিস্তান আমলেই ঝালকাঠিকে দ্বিতীয় কলকাতা হিসেবে অধ্যুষিত করা হয়। ১৯৮২ সালের দিকে এসে লবণ তৈরীর আধুনিকায়ন শুরু হলে ঝিমিয়ে পড়তে শুরু করে দেশীয় পদ্ধতিতে উৎপাদিত লবণ। কক্সবাজার এবং বাগেরহাটের কর্দমাক্ত লবণ এনে ঝালকাঠিতে শোধন করে প্রয়োজনীয় আয়োডিন মিশিয়ে তা বাজারজাত করা হয়। কিন্তু কয়েকটি আধুনিক লবণ তৈরীর কারখানা হওয়ায় আমাদের দেশীয় লবণের চাহিদা দিন দিন কমে যাচ্ছে। কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা জানান, আমরা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা লবণ উৎপাদন করে প্রতিষ্ঠানে বসেই বিক্রি করি। প্রত্যন্ত এলাকার দোকানীরা এসে আমাদের কাছ থেকে কিনে নেয়। কিন্তু বড় কোম্পানীগুলো তাদের জনবল ও গাড়ি দিয়ে বাজারে বাজারে লবণ পৌছে দেয়। সেটা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি হলেও দেখতে দৃষ্টি নন্দন হওয়ায় ক্রেতাদের চাহিদা ওই লবণের দিকেই বেশি। ঝুঁকির কারণ ও প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করে আবু সালেক শরীফ জানান, চীন থেকে ওষুধ তৈরীর সরঞ্জাম হিসেবে সোডিয়াম সলফেট আনা হয়। যা উন্নত কোম্পানীগুলো লবণ শোধনে ব্যবহার করে। যার ফলে লবণ সাদা ধবধবে হয়। মানবদেহের জন্য তা অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। দেশীয় লবণ উৎপাদনে মূলত সোডিয়াম ক্লোরাইড ব্যবহার করা হয়। যা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। প্রবীণ লবণ ব্যবসায়ী বরকত সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক মালিক ও সাবেক পৌর কমিশনার মোঃ হাবিবুর রহমান তালুকদার জানান, লবণের আদি সৃষ্টি ঝালকাঠি ও চাঁদপুরে। তখন কক্সবাজার ও বাগেরহাট থেকে কর্দমাক্ত চাকা লবণ এনে যাতাকলে ভেঙে লবণকে খাদ্যোপযোগী করা হতো। মানুষের খাদ্যে, পশু-প্রাণির খাবারে, বরফের মিল, লোহা তৈরীর কারখানা, কাগজের মিল, চামড়ার পচন থেকে রক্ষা করার জন্য লবণের ব্যবহার করা হয়। এজন্য স্বাস্থ্য সম্মত দেশীয় উৎপাদিত মোটা লবণ অপরিহার্য। মেসার্স রূপালী ভান্ডারের ম্যানেজার জানান, আমাদের দেশীয় লবণ প্রতি কেজি ১৫ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। উন্নত কোম্পানীর লবণ অস্বাস্থ্যকর হলেও তা প্রতি কেজি ৩০ থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। উন্নত কোম্পানীগুলো চাচ্ছে তাদের চাপে আমাদের কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গেলে ক্রেতাদের ইচ্ছেমতো জিম্মি করে চড়া দামে বিক্রি করতে পারবে। আমাদের দেশীয় পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদনের ফলে ক্রেতা সাধারণের ক্রয়সীমার মধ্যে দাম রয়েছে। ঝালকাঠি জেলা লবণ ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি মোঃ ফজলুল হক হাওলাদার জানান, লবণ তৈরীর বড় বড় মিল-কারখানাগুলোতে মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর সোডিয়াম সালফেট ব্যবহার করছে। যার কারণে তাদের লবণের চেহারা সাদা ধবধবে হয়। কিন্তু আমাদের দেশীয় পদ্ধতিতে উৎপাদিত লবণে পরিমাণ মতো আয়োডিন এবং সোডিয়াম ক্লোরাইড ব্যবহার করা হয়। যা স্বাস্থ্য সম্মত এবং মানবদেহের আয়োডিন ও লবণের অভাবে রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

Leave a Comment